সশস্ত্র কার্যক্রমঃ
ইসলামি আন্দোলনের কিছু কিছু দল মনে করে, সামরিক কার্যক্রম হলো দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য সবচেয়ে উপকারি মাধ্যম। তাদের ধারণা সশস্ত্র উপস্থিতি ছাড়া কোন ভাবেই আমাদের সফলতা আসবেনা। তাদের শ্লোগান হলো কবি আবু তাম্মামের দুটি পংক্তিঃ
তরবারি বেশি সত্য বাদী পুথি ও পুঁজির চেয়ে
অসির ধারই আসল কিম্বা নকলের ফয়সালা ,
ঝলসে ওঠা তলোয়ার ওগো, কালো বই-পাতা নয়,
দূর করে দেয় মনের সতত সন্দেহ-বিষ-জ্বালা।
এদের কেও কেও একটা সহীহ হাদিস দিয়ে নিজেদের কর্মপদ্ধতিকে সঠিক প্রমান করার চেষ্টা করে। হাদিস টা হলো, মহানবী (সা) বলেছেনঃ “কেও কোন মুনকার তথা খারাপ কাজ দেখলে তা হাত দিয়ে বদলিয়ে দাও। না পারলে মুখের কথা দিয়ে বদলে দিতে তৎপর হও। তা না পারলে মনে মনে এটা বদলানোর চেষ্টা চালাও। আর এটাই হলো খুব দূর্বল ইমানের পরিচায়ক”। এই সব ভাই বোন দের প্রশ্ন হলো, আমরা কেন স্বেচ্ছায় একেবারে নিচের দলের ‘মন দিয়ে মুনকার বদলানোর’ সাথে যুক্ত হবো? যেটাকে সবচেয়ে দূর্বল ইমানের পরিচায়ক বলা হয়েছে। কেনই বা আমরা মাঝের দলেও থাকবো, যেখানে শুধু কথা বলে খারাপ বদলানোর চেষ্টা থাকবে? তাদের কথা হলোঃ আমাদের উচিৎ হলো একেবারে উন্নত পর্যায়ে থাকা। অর্থাৎ শক্তি প্রয়োগ করেই আমাদের মুনকার বদলে দিতে হবে।
এরা ভুলে যান মুনকার বদলানোর এই পর্যায় গুলো মানুষের সামর্থানুযায়ী হতে হয়। যার শক্তি প্রয়োগ করার সামর্থ আছে, সে অবশ্যই শক্তি প্রয়োগ করবে। যেমন বাবার সামর্থ্য আছে ছোট সন্তানদের উপর শক্তি প্রয়োগ করে ‘মুনকার’ তাড়িয়ে দেবে। অভিভাবক তার অধীনের উপর শক্তি প্রয়োগ করতে পারে। রাষ্ট্রপ্রধান তার রাষ্ট্রের সীমানায় থাকা মুনকার বদলাতে শক্তি প্রয়োগ করবে। কোম্পানির মালিক তার সীমানার মধ্যে চলতে থাকা ‘মুনকার’ বিদায় করতে শক্তি প্রয়োগ করতে পারে। ইসলাম এদেরকে স্ব স্ব স্থানে ‘মুনকার’ বদলে দিতে নির্দেশ দিয়েছে, এবং তা না করলে গুনাহগার হবে বলে দিয়েছে। ফিক্বহ শাস্ত্রে এটা সার্বজনীন সত্য যেঃ কোন ‘মুনকার’কে শক্তি প্রয়োগ করে প্রতিরোধ করতে যেয়ে, যদি আরো বড় ‘মুনকার’ ঘটে যায়, তাহলে চুপ থেকে মনে মনে ওটা বদলে দেয়ার প্লান করতে থাকাই অধিক শ্রেয়। তাই সশস্ত্র সংগ্রাম বা শক্তি প্রয়োগ করে ‘মুনকার’ বদলে দেয়ার চেষ্টা, যার তার জন্য যখন তখন ‘মুবাহ’ করে দেয়া হয়নি। বিশেষ করে এতে করে যদি রক্তপাত হয়, বা বাড়ি ঘর ধ্বংশ হয়, কিংবা যে ‘মুনকার’ ছিলো সেই ‘মুনকার’ ই থেকে যায় -সে ক্ষেত্রে শক্তি প্রয়োগের অনুমতি দেয়াই যায়না। ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি, সরকারের বিরুদ্ধে করা কোন কোন ব্যক্তি বা দলের সশস্ত্র সংগ্রাম অনেকাংশে ব্যর্থ হয়েছে।
আমাদের অভীষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছুতে যে সব বাঁধাঃ
ইসলামের প্রচারকদের উচিৎ আমাদের অভীষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছুতে, ইসলামকে দুনিয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত করতে এবং সমস্ত বাঁধা সমূহ দূরে ফেলে দিতে কাজ করে যাওয়া, সংগ্রাম সাধনা করতে থাকা। মূলত আমাদের ভেতর বাইরের অনেক বাঁধা আছে। আমি স্বীকার করছি, আজ ইসলামি আন্দোলনে সাফল্য আনতে বাইরের বাঁধা অনেক। আছে। কিছু শক্তি তো আছে, ইসলামের বিরুদ্ধে যারা ষড়যন্ত্রে চব্বিশ ঘন্টাই নিরত। ওরা ইসলাম পন্থীদের ক্ষতি করার জন্য সব সময়েই ওঁৎ পেতে থাকে। তারা লক্ষ কোটি টাকা ইসলামি আন্দোলনের গতি রোধ করতে, তার বিচ্ছুরিত আলো নিভিয়ে দেয়ার মানসে, আন্দোলন সমূহের মধ্যে ফাটল ধরাবার তাগিদে কিংবা ইসলামের উলামা দের শক্তি খর্ব করার অভিপ্রায়ে ঢেলেই চলেছে। তাদের এই ষড়যন্ত্র নতুন কিছু না। বরং এটাই কিন্তু স্বাভাবিক। কুরআন এব্যাপারে আমাদের অনুক্ষণ সচেতন করে যাচ্ছেই। আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ “ওরা তোমাদেরকে দ্বীন থেকে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য যুদ্ধ করতেই থাকবে”। (আলবাকারাহঃ ২১৭) তিনি আরো বলেছেনঃ “কাফিররা আল্লাহর পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার জন্য তাদের অর্থ খরচ করে যাচ্ছেই। তারা আরো খরচ করবে। এর পর এই বৃথা খরচ একদিন তাদের মন-পীড়ার কারণ হবে, তার পর তারা হবে পরাজিত”। (আলআনফালঃ ৩৬) “তারা মুখের ফুৎকারে আল্লাহর নূরকে নিভিয়ে ফেলতে চায়। কিন্তু আল্লাহ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁর নূরের তিনি পূর্ণতা বিধান করবেনই। যদিও তা কাফিরদের জন্য অপ্রীতিকর হোক”। (আততাওবাহঃ ৩২)
এটাও জানা যে, ইসলাম বিরোধিদের একটা বিশাল গ্রুপ ইসলাম পন্থীদের বিরুদ্ধে বাইরের শত্রুদেরকে সহযোগিতা করে থাকে। ‘যেমন ভাবে খাবার ভরা প্লেটের দিকে পেটুকেরা ধেয়ে আসে’, তেমন ভাবে ভেতর বাহির সব যায়গা থেকে মানুষ একট্টা হয়ে ইসলাম পন্থীদের শেষ করার জন্য তেড়ে আসে। আন্তর্জাতিক যায়োনিস্ট, পাশ্চাত্যের খৃষ্টান মিশনারী, প্রাচ্যের মুর্তিপূজক, নাস্তিক কম্যুনিস্ট, ভোগবাদী দর্শণের ধারক বাহক, কিংবা ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজা ধারীদের ইসলাম বিরোধি অবস্থান দেখলে মহানবী (সা) এর হাদিসের কাল্পনিক ছবিটা আমাদের সামনে আজ যেন জ্বলজ্বল করে ফুটে ওঠে।
আমি এখন আমাদের ভেতরের বাঁধাগুলোর উপর কিছুটা আলোক সম্পাৎ করতে চাই। এসব বাঁধা কিন্তু অনেক। তবে নীচের বিষয় গুলো আসলেই গুরুত্বপূর্ণঃ
কাজের ফলাফল নিয়ে সংশয় ও নিরাশাঃ
কিছু কিছু খুব ভাল মানের ধার্মিক মানুষ আছেন যারা আন্দোলনের সাথে কোন কাজ করতে আর চাইছেন না। তাদের সমস্যা হলো, ইসলামের জন্য কোন কাজ করে, বিশেষ করে ইসলামি আন্দোলনের জন্য কাজ করে ভবিষ্যতে কিছু হবে – এ আশা তাদের আজ নেই। তারা মনে করে, ফসল পাওয়ার আশ না করে চাষ কাজ করলে যেমনটা হয়, তেমনি আজ ইসলামি আন্দোলনের সাথে কাজ করা। বিজয়ের কোন সম্ভাবনা নেই। তাদের কথা হলো এখানে কাজ করার মানে, গাছ লাগিয়ে ফল না পাওয়ার আশায় বসে থাকা। এদের ধারণা হলো, ইসলামি আন্দোলন শুরু হবার পর যুগ যুগ চলে গেল, অথচ কোন একটা দেশেও তার টার্গেটে পৌঁছুতে পারেনি। কেউ তাদের প্লান মুতাবিক স্থানে যাইতে পারেনি। বরং এগুলো হয় বাইরের শত্রুদের দিয়ে ভেঙ্গে তছনছ করে হচ্ছে, নইলে আভ্যন্তরীন গন্ডগোলের মাধ্যমে নিজেরাই টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। কাজেই যে সব কাজে আমাদের প্রত্যাশা পূরণ হয়না তাতে সময় দেয়ার কি যুক্তি থাকতে পারে? তাদের বক্তব্যের সারমর্ম হলঃ ‘ইসলামি আন্দোলনের কোন ভবিষ্যৎ নেই’।
আমি এদেরকে প্রথমতঃ বলি, দেখুন, পরিবেশ যতই বৈরী হোক না কেন; প্রশস্ত দুনিয়া আপনার উপর যতই সংকীর্ণ হয়ে আসুক না কেন, একজন মু’মিনের জন্য নিরাশ হওয়া সাজে না। পড়ে দেখুন আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ “আল্লাহর রহমাত থেকে নিরাশ হয় একমাত্র কাফিররাই”।(ইউসুফঃ ৮৭) এটা ছিলো ইয়াকুব (আ) এর বক্তব্য। হুবহু এমন কথা তাঁর দাদা ইব্রাহীম(আ)ও এভাবে বলেছিলেনঃ “আল্লাহর রহমাত থেকে নিরাশ হয় শুধু মাত্র বিভ্রান্ত লোকেরাই”। (আল হিজরঃ ৫৬)
কাজেই একজন সত্যনিষ্ঠ মু’মিন কখনো নিরাশ হয়ে যেতে পারেনা, পারে না ভেংগে পড়তে। কারণ সে জানে, আজ না হোক কাল তো সুদিন আসছেই। সে জানে প্রতিটি বিপদের সাথে থাকে প্রাপ্তি; নিকষ রাতের শেষে আসে সোনালী সকাল। দিন কখনোই একরকম থাকেনা। আজকে যা খুবই বাস্তবিক বলে মনে হচ্ছে, কাল তা হয়ে যাতে পারে স্বপ্নের মত। কাজেই আজকের স্বপ্নটা কালকের বাস্তবতায় পরিনত হওয়া অসম্ভব না।
দ্বিতীয়তঃ মু’মিনের কাজ যে শুধু সফলতা বা বিজয় নির্ভর হতে হবে এমন নয়। আমরা কাজ করি আল্লাহর আদেশ মানতে, তাঁর দাসত্ব প্রতিপালন করতে, এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করার জন্যে। যদি এর সাথে আমাদের সফলতা আসে, বিজয়ের মালা আমরা পরি, তাহলে তো খুবই বরকতের ব্যাপার। এটা আল্লাহর অশেষ কৃপা ও অসীম রহমাত হলে সম্ভব হয়। কিন্তু বিজয় সফলতা যদি আমাদের ভাগ্যে না আসে তা হলে আমরা কর্তব্য পালনে তো অবহেলা করতে পারিনা। আমরা তাঁর বাণীতো মানুষের কাছে আমরা পৌঁছে দিচ্ছি। আল্লাহ কিয়ামতে আমাদের কাছে জিজ্ঞেস করবেন নাঃ ‘তোমরা কেন বিজয় লাভ করতে পারনি’? বরং তিনি আমাদের কাছে প্রশ্ন করবেনঃ “তোমরা কি আমল করেছো?”
অনেক নবী রাসূলগণকে আমরা দেখেছি যারা দাওয়াত দিতে যেয়ে শহীদ হয়ে গেলেন। অথচ জীবনে যে স্বপ্ন দেখে ছিলেন তা বাস্তবে দেখে যেতে পারেননি। সূরা বুরূজে একদল ইমানদার সম্পর্কে বলা হয়েছে। আল্লাহর পথের চলতে যেয়ে তাদেরকে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। অথচ ইমানের পথ থেকে, সবরের কর্মপন্থা থেকে তারা এক চুল পরিমান বিচ্যুত হননি। “অভিশপ্ত হয়েছে গর্ত ওয়ালারা অর্থাৎ, অনেক ইন্ধনের অগ্নিসংযোগকারীরা; যখন তারা তার কিনারায় বসেছিল। এবং তারা বিশ্বাসীদের সাথে যা করেছিল, তা নিরীক্ষণ করছিল। তারা তাদেরকে শাস্তি দিয়েছিল শুধু এ কারণে যে, তারা প্রশংসিত, পরাক্রান্ত আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছিল, যিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের ক্ষমতার মালিক, আল্লাহর সামনে রয়েছে সবকিছু”। (আল বুরুজঃ ৪-৯)
সূরা আ’রাফে একটা ঘটনার উল্লেখ দেখা যায়। আমাদের জন্য সেখানে রয়েছে অনেক অনেক শিক্ষা, রয়েছে অনেক উপদেশ।দেখুন যারা দ্বীনের দা’ওয়াত পেশ করেন, আশ পাশের সবার মন যে তিনি জয় করতে পারবেন, এমন টা সব সময় নাও হতে পারে। সূরার এই ঘটনায় দুই গ্রুপের কথোপকথন আল্লাহ তাআলা রেকর্ড করে রেখেছেন। এক গ্রুপ ছিল দাওয়াতি কাজ করতে করতে এর ফলাফল সম্পর্কে একেবারে নিরাশ। অন্য গ্রুপ ছিল যে কোন অবস্থায় দাওয়াতি কাজ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষপাতি। আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ “আর যখন তাদের মধ্যে থেকে এক সম্প্রদায় বলল, কেন সে লোকদের সদুপদেশ দিচ্ছেন, যাদেরকে আল্লাহ ধ্বংস করে দিতে চান কিংবা আযাব দিতে চান কঠিন আযাব? সে বললঃ তোমাদের পালনকর্তার সামনে দোষ ফুরাবার জন্য এবং এজন্য যেন তারা ভীত হয়। অতঃপর যখন তারা সেসব বিষয় ভুলে গেল, যা তাদেরকে বোঝানো হয়েছিল, তখন আমি সেসব লোককে মুক্তি দান করলাম যারা মন্দ কাজ থেকে বারণ করত। আর পাকড়াও করলাম, গোনাহগারদেরকে নিকৃষ্ট আযাবের মাধ্যমে তাদের না-ফরমানীর দরুন”। (আল আ’রাফঃ ১৬৪-১৬৫) এই গ্রুপটা দাওয়াতি কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল আল্লাহর কাছে কৈফিয়ত দিতে পারার আশায়, আর মনে করতেছিলো ওরা হয়ত দাওয়াত গ্রহন করে ভালো হয়ে যাবে। এভাবে আমরা দেখতে পেলাম কিভাবে প্রতিকুল পরিবেশে দাওয়াতি কাজ চালিয়ে যাওয়া মানুষেরা আল্লাহর আযাব থেকে রেহায় পেল, অথচ জুলুম বাজরা এর পর ধ্বংশ হয়ে গেল।
তৃতীয়তঃ আমরা যদি মনে করি এতদিন কার দাওয়াতি কাজ কোন টার্গেটেই পৌঁছতে পারেনি। ইসলামি আন্দোলন সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে গেছে কিংবা দীর্ঘ দিনের সমস্ত সংগ্রাম সাধনা কোন কাজেই লাগেনি। আমার মনে হয়, এ ধরণের কথা আন্দোলনের উপর সব চেয়ে বড় জুলুম আর অনেক বেশি অবিচার। আপনারা কি দেখেন না, এই আন্দোলনের প্রভাবে অধুনা বিশ্ব কিভাবে জেগে উঠেছে? পূর্বে হোক কিংবা পশ্চিমা দেশগুলোতে, ইসলামি আন্দোলন মানুষের চেতনায়, অনুভুতিতে এবং জাগৃতিতে দেখেন না কেমন প্রভাব ফেলেছে? নারী পুরুষ, বিশেষ করে লক্ষ লক্ষ তরুন তরুনীরা আজ সঠিক পথের দিশা খুঁজে পেয়েছে। আজ ইসলামি আন্দোলনের ছোঁয়া জীবনের সর্বস্তরে দেখা যাচ্ছে। ফারদ্ বা ইবাদাত মেনে চলার কথা বলুন, ব্যবহার চরিত্র কিংবা আচার আচরণের কথা বলুন, মেয়েদের হিজাবের কথা বলুন- সব খানেই আজ ইসলামি আন্দোলনের প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। ইসলামি অর্থনীতির প্রতি প্রবল ঝোঁক, ইসলামি রাজনীতিতে সকল মত পথের আলিমদের অংশগ্রহন, জিহাদ ও মুক্তি সংগ্রামের দিকে মুসলমানদের মিছিল, ইসলামি শিক্ষা ও সংস্কৃতির ময়দানে মানুষের পদচারণা, প্রচার ও মিডিয়াতে মুসলিমদের ভাল ধরণের পদক্ষেপ, সংবাদ পত্রিকা, রেডিও, স্যাটেলাইট চ্যানেল গুলোতে আমাদের পথচলা, সর্বোপরি ইসলামি পাঠাগার সমূহে নানাবিধ গ্রন্থের ভীড়- এ সবই ইসলামি আন্দোলনের অর্জিত ফসল।
ইসলামি সন্মেলন সংস্থা (ও আই সি), ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক, আইসিসকো, বিভিন্ন দেশ সমূহে সফল ইসলামি ব্যাংকিং পদ্ধতির প্রচলন, অনেক গুলো নামকরা চ্যারিটি অরগানাইজেশান তো এরই প্রভাবে আজ আমাদের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সংখ্যায় কম হলেও ইরানের শিয়া ইসলামি রাষ্ট্র, সুদানে সুন্নি ইসলামি রাষ্ট্র, আফগানে কম্যুনিজম বিতাড়ন, ফিলিস্থিন ও লেবাননের ইসলামি আন্দোলন কিন্তু এই জাগৃতির ই ফলোশ্রুতি। এর সাথে আমরা দেখতে পাচ্ছি পাশ্চত্যে কিংবা প্রতিচ্যের সব মুসলিম সংখ্যালঘু এলাকাতে ইসলামের দাওয়াতি কাজ দিন দিন এগিয়েই চলছে।
স্বপ্নের জগতে বাসঃ
কিছু লোক আছে যারা কাজ করেনা। ওরা এক স্বপ্নময় জগতে বাস করে। ওরা ইউটোপিয়ার (আদর্শ সমাজ নির্মানের এক তাত্ত্বিক) দর্শনে এমন ভাবে মজে গেছে, তা থেকে বের হতেও পারছেনা আর। তারা প্রথম চোটেই সব গুলোকে কামালিয়াতের পর্যায়ে নিতে চায়। যেন বাচ্চার জন্মই হতে হবে যৌবনের ধাপেই। যেন আকাশের প্রথম চাঁদটা পূর্ণিমার মতই ডকমকে হয়ে উঠতে হবে। ওদের মতে বীজ বপনের পরে অংকুরোদ্গমের সাথেই যেন ফলভারে নুয়ে থাকা গাছের জন্ম হতে হবে। ওদের ধারণা হলো ইসলামি আন্দোলনের কাজ পরিপূর্ণ জীবন-ব্যবস্থা কায়িম করেই শুরু হবে। তারা মনে করে, একটার পর একটা স্তর পেরিয়ে ইসলামি আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়া লাগবে না। তাদের মতে ইসলামি আন্দোলনে পারিপার্শ্বিকতার কোন আবিলতা লাগতেই পারবেনা; জীবনের কোন বালাই এখানে আসবেনা; কিংবা কন্টকাকীর্ণ পথ এখানে পার হওয়া লাগবেনা।
এরা অপদার্থ। এরা কাজ করেনা; কাজ করতেও দেয়না। এরা খুব মুখরা স্বভাবের। অভিজ্ঞতা এদের খুব কম। সমালোচনায় এরা মুক্তকন্ঠ। কোন কিছু গড়তে তারা সম্পূর্ণ ভাবেই অপারগ। এদের একমাত্র কাজ হলো ময়দানে যারা কাজ করছেন তাদের পদস্খলন খুঁজে বের করা। এর পর সে গুলোকে একখানে জড়ো করে অনুবিক্ষণ যন্ত্র দিয়ে সেগুলোকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বড় করে তুলে ধরা। এরপরে শুরু হয় একটা ছোট বীজের মত বিষয়টাকে বিরাট গম্বুজ করে দেখানো, কিংবা ছোট পিপড়ের মত জিনিষকে হাতির মত করে তুলে ধরা।
এরা কারো কোন ওজর আপত্তির কেয়ার করে না। কারো প্রতি ভালো ধারণাও রাখতে চায়না। এরা কখনো পারিপার্শ্বিক অবস্থা বুঝতে পারেনা। এরা ‘জরুররাতের’ সময়েও হুকুম আহকাম সম্পর্কে কিছুই জানতে চায়না। যেহেতু তারা কাজ করেনা, কাজেই তাদেরও যে ভুল হয় মানতেও চায়না। কারণ কাজ করলেই না ভুল হয়, কিছু না করলে ভুল হবে কি করে?
এই সব মুখলিস ভায়েরা ধোঁকার মাঝে আছে। এরা বড় বড় কাজ করার স্বপ্নে বিভোর। আল্লহর ব্যাপারে এরা যেন এক ধোঁকার মধ্যে পড়ে আছে।
এদের মনে রাখা দরকার, ইজতিহাদ অনুযায়ি কাজ করতে যেয়ে ভুল করে ফেললে আল্লাহ তা মাফ করে দেন। বরং ভুল হলেও ইজতিহাদ করার সওয়াব ও এই ধরণের কাজ করা মানুষেরা পাবেন। মনে রাখা দরকার, সাধারনতঃ মানুষের ভুল হয়ে থাকে কর্ম পদ্ধতিতে, কাজ করার ধরণে। আর এই সব কর্ম পদ্ধতি বা কাজ করার ধরণ জীবনের মান উন্নয়নের কারণে উন্নতি লাভ করে, এবং স্থান-কাল-পাত্র ভেদে সে গুলো বিভিন্ন হয়ে থাকে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী, এর ‘মাকাসিদ’ গুলো মেনে এবং এর নীতিমালা গুলোকে মাথায় রেখে আমাদের ভবিষ্যতের টার্গেট নির্ধারণ করতে হবে। এরপর সেই টার্গেটে পৌঁছতে সংগ্রাম সাধনা করে যেতে হবে। তা করতে যেয়ে আমাদের চলতে হবে কুরআন ও হাদীসের দেখানো পথে। সালফে সালিহীনের জীবন থেকে শিক্ষা নিতে হবে। তার পরবর্তী যুগের অভিজ্ঞতাকেও আমাদের পাথেয় বানাতে হবে। জ্ঞান বিজ্ঞান, সে যেখান থেকেই আসুক, আমাদের গ্রহন করতে হবে। আমাদের কাছে আলো বাতাস আসতে পারে এমন কোন দরোযা বন্ধ রাখা কোন ক্রমেই ঠিক হবেনা। তবে যারা কাজ করতে চায়না অথচ অন্যের কাজের ভুল ভ্রান্তি নিয়ে ব্যস্ত থাকে তাদের কে কবির ভাষায় আমি বলিঃ
“দুনিয়ার কাজ দেখে যারা সমালোচনায় বিভোর, তুমি কী করতে পার, মানুষকে একটু দেখাওনা।
কোন কাজ দেখেই বলোনাঃ ওটা ভুল। বরং তার চেয়ে ভালো কোন কাজ করে তারপর বলোঃ আমারটাই সেরা।
রাতের কোল থেকে যদি চাঁদ হারিয়ে যায়, তাহলে ছোট প্রদীপকে অবহেলা করা খুবই গর্হিত কাজ”।
একটা সহীহ হাদিসে মহানবী (সা) বলেছেনঃ কোন লোক যদি বলেঃ “মানুষেরা শেষ হয়ে গেল”। তাহলে বুঝতে হবে সে-ই হলো ‘আহলাকুহুম’। এখানে আহলাকুহুম, বা আহলাকাহুম এই দুই ভাবে পড়া যায়। প্রথম পাঠে অর্থ দাঁড়াবেঃ সে-ই হলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। কারণ সে অহংকারি, সে নিজের কাজকেই বেশি ভালো মনে করে। সে অন্য সম্পর্কে খারাপ ধারণা করে। কাজেই সে অন্যের কাজ গুলোকে ভুল মনে করেই চলছে।
দ্বিতীয় পাঠে ‘আহলাকাহুম’ এর অর্থ হলো সে নিজেই এই লোকগুলোকে শেষ করে দিলো। কারণ এদের সম্পর্কে তার খারাপ ধারণা, তাদের চেয়ে নিজকে বড় মনে করা, এবং তাদের ভালো হওয়ার ব্যাপারে তার নিরাশ হয়ে যাওয়াটা ঐসব লোকদের খারাপ হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের সাথে কাজ করলে, হয়ত তারা তার কাছথেকে অনেক উপকৃত হতে পারত।
ইমাম খাত্তাবী বলেনঃ কিছু কিছু মানুষ আছে, সব সময় অপরের দোষ ধরেই চলে তারা। অন্যের খারাপ দিক গুলো নিয়ে সমালোচনা তাদের অভ্যাস। সব সময় নেতিবাচক তারা। বলতে থাকেঃ “আহারে মানুষ গুলো শেষ হয়ে যাচ্ছে। উচ্ছন্নে যাচ্ছে সবাই”। এই লোক গুলোই মুলত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। তাদের অবস্থাই বেশি খারাপ। কারণ তার গীবত, অন্যের দোষ ধরার প্রবনতা, অন্যের ভুল নিয়ে প্রচার প্রোপাগান্ডা তাকে অহংকারী করে তোলে। ফলে নিজেকে নিজেই ক্ষতি করে বেশি।
No comments:
Post a Comment